মমিনুল মউজদীনঃ জোছনার কবি,জনতার নেতা

জেনারুল ইসলাম :
একজোড়া কালো চোখ বসে থাকে যে শহরে
অপেক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে
সে শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়?
– (কবিতা-ভালোবাসার শহর)।
পূর্ণিমা রাত ঝলমলে পুরো শহর। জলের শহরে জোছনার আলো নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর। পুরো শহরের ল্যাম্পপোস্টের লাইট নিভিয়ে দিয়ে জোছনাবিলাস করার সুযোগ দিলেন নগরবাসীকে। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে নজর কাড়লেন দেশ-বিদেশের সবার। আলোচনায় তরুণ জনপ্রতিনিধি মমিনুল মউজদীন।
মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজার প্রপৌত্র দেওয়ান মমিনুল মউজদীন রাজ পরিবারে জন্ম নিয়েও কবিতাকে ভালোবেসে মিশেছেন জনতার সাথে। বিপ্লবী চেতনাকে বুকে ধারণ করে রাজপথে মেতেছেন। হাজারো তরুণকে দেখিয়েছেন সত্য,সুন্দর ও আগামীর পথ। সবকিছুকে ছাড়িয়ে ভালোবেসেছেন কবিতাকে। সুনামগঞ্জকে পরিচিত করেছেন জল-জোছনা ও কবিতার শহর হিসেবে।
“এ শহর ছেড়ে পালাবো কোথায়?”, “হৃদয় ভাঙ্গার শব্দ”- দুটি তাঁর কবিতার বই। কবিতা আর দেশপ্রেম দুটোকে সমানতালে কাজে লাগিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন সহজেই। যার সহজ প্রমাণ মিলে সড়ক দুর্ঘটনায় কবির অকাল প্রয়াণের খবর সুনামগঞ্জবাসীকে কতটা শোকাতুর করে তুলে তার চিত্র।
পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েও তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে মমিনুল মউজদীন ছিলেন একটি আদর্শ জনপ্রতিনিধি।
যে কবি বলতেন ‘এ শহর ছেড়ে পালাবো কোথায়’,- তিনিই পালিয়েছেন আমাদের ছেড়ে বড়ো অসময়ে।
কবিকে চিঠি দিতে ইচ্ছে হয়। জানতে ইচ্ছে হয় কবির জল-জোছনা আর কবিতার শহর ছেড়ে তিনি কেমন আছেন?
কবি মুমিনুল মউজদীনের চিঠি কবিতার ভাষায় কবির অদৃশ্য আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদন-
” প্রিয় বন্ধু,তুমি কেমন আছো?
কতোদিন তোমাকে দেখি না
তোমার লাবণ্য মুখ
কাজল চোখ রক্তিম ঠোঁট
কপালের উপর ঝলমলে লকেট
মসৃণ হাতের সবুজ চুড়ি
কতোদিন হয়ে গেলো এসব দেখি না”
– (কবিতা চিঠি)।
সড়ক দুর্ঘটনায় কবি সস্ত্রীক অকালে চলে গেলেন কবিতার শহর ছেড়ে। তরুণদের নিয়ে আজন্ম স্বপ্ন দেখতেন এই মানুষটি। তরুণের হাত ধরে নবপ্রজন্মের সূচনা হবে এই বিশ্বাস ধারণ করতেন মননে-মগজে। রাজনৈতিক সচেতন এই মানুষটি ভাবতেন দেশ ও প্রজন্ম নিয়ে।
সবকিছুর উর্ধ্বে ছিলেন সাহিত্যের নিভৃতচারী সাধক। শব্দচাষী,কবিতার সৃষ্টিশীল স্বত্তা।
” আমার ক্ষুধা ও শক্তি তোমার কাছেই
আমার বিরহ আর মিলনের প্রথম যন্ত্রণা
তোমার গভীরে উন্মীলিত ”
-(কবিতা- তুমি যাও তুমি আসো)
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তখন ভয়াবহ সিডর আঘাত হানে। সেই সিডরের ক্ষত বিক্ষত ঢেউ আছড়ে পরে সুনামগঞ্জবাসীর হৃদয়ে। ২০০৭ সালের ১৫ ই নভেম্বর ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ফেরার পথে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইলে নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন কবি মমিনুল মউজদীন। স্ত্রী তাহেরা চৌধুরী,ছেলে কহলিন জিবরান ও চালক কবির মিয়া ঘটনাস্থলেই মারা যান। কোনমতে বেঁচে যান বড়ো ছেলে ফিদেল নাহিয়ান। সিঙ্গাপুরে সুদীর্ঘসময় চিকিৎসার পর এবার তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।
কবি ও জনতার নেতা মমিনুল মউজদীনকে স্মরণ করে ২০০৭ সালের ০৮ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা স্টেডিয়াম একটি শোকসভার আয়োজন করা হয়। এতে জাতীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তন্মধ্যে বরুণ রায়,ড.কামাল হোসেন,সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, দেওয়ান ফরিদ গাজী, আবুল মাল আব্দুল মুহিত,রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু,আসাদুজ্জামান নূর,সুলতান মনুসুর প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
স্টেডিয়াম ভর্তি ছিলো শোকার্ত মানুষের আহাজারি। এ যেন স্টেডিয়াম ভর্তি শোক।
সেদিন একজন কবি মমিনুল মউজদীন ও জনপ্রতিনিধি মমিনুল মউজদীন নিয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন ভাঁটি বাংলার সিংহপুরুষ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।
তিনি বলেছিলেন “একজন মমিনুল মউজদীনকে আপনারাই তৈরী করেছিলেন। আগামী প্রজন্মের জন্য আরো মমিনুল মউজদীন তৈরী করতে হবে”।
আমরা বিশ্বাস করি একজন মমিনুল মউজদীন দূরে থাকলেও রয়েছেন আমাদের মননে মগজে,বিশ্বাসে। কবিতার শহরে, জল-জোছনার শহরে আরো মমিনুল মউজদীন তৈরী হোক এটাই প্রত্যাশা। তরুণের নিয়ে যে স্বপ্ন ও বিশ্বাস মমিনুল মউজদীনের ছিলো তা পূর্ণ হলেই ওপারে সুখে থাকবেন জনতার নেতা,জোছনার কবি মমিনুল মউজদীন।
“দূরের মানুষ দূরে থাকাই ভালো
সাইবেরিয়ান হাঁসের মতো দূরে
কাছে এলে দুরত্বটা বাড়ে
দূরে গেলে বিরহের উত্তাপে
নির্বাপিত তৃষ্ণা আবার জাগে”
– কবিতা- দূরের মানুষ
কবি মমিনুল মউজদীন।
লেখক-
জেনারুল ইসলাম
পূর্ব দরগা গেইট,আম্বরখানা, সিলেট।