হযবরল সিদ্ধান্ত ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা

মোহাম্মদ আব্দুল হক :

একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সরকার কিংবা রাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই অস্থির ও হযবরল সিদ্ধান্ত আমাদেরকে ব্যর্থ করে দেয়। এজন্যে একক বা প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নির্ধারকদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অক্ষমতা দায়ি। প্রয়োজন আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা অর্জন ও সংরক্ষণ। ‘আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা ও সংরক্ষণ’ কথাটি এখানে কঠিন বিষয় নয় ; বরং সহজে বুঝার বিষয় মানুষ হিসেবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ যেনো বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আমরা নিজেরাই সংরক্ষণ করতে পারি। আমরা জীবনে একটু একটু করে বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আমাদের সামনে অনেক বিষয় চলে আসে যার অনেক কিছুই আমরা আয়ত্বে পেয়ে যাই এবং সময়ে এসব বিষয় আমাদেরকে অনেকটা প্রভাবিত করে। তখন আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে আমরা যে বিষয়ে আকৃষ্ট হয়েছি তা আর আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে না ; বরং ওই বিষয় সমূহের প্রতি অন্ধ আকর্ষণের কারণে আমাদের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওই আকর্ষণীয় বিষয়ের হাতে। এভাবে চলতে চলতে একসময় আমরা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা এমনভাবে হারাই যে আমরা মূলের খবরে হয়ে যাই উদাসীন। আমরা নিজেদের ক্ষতি করার পাশাপাশি মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-মামা, ফুফু-খালা সহ পরিবারের মূল স্রোতের স্বাভাবিক পারিবারিকতা বা সামাজিকতার বাইরে গিয়ে পরিবারেরও ক্ষতি করে ফেলি। এভাবে ক্ষতির কাজটি অধিকাংশই তরুণ-তরুণীদের দ্বারা হয়ে যায়। আবার বড়োদের দ্বারাও পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন বিষয়ে অক্ষমতা বড়ো বিপর্যয় ঘটায়। এ ব্যাপারগুলো ওদেরই ব্যর্থতা। কিভাবে?

আসুন আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা ও সংরক্ষণ বিষয়টা সহজে বুঝার জন্যে কিছু উদাহরণ সামনে তুলে ধরি। মনে করুন আপনি বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আপনার মা-বাবা আর আগের মতো আপনার অনেক কিছুতে কড়াকড়ি করেন না। তারা বিশ্বাস করলেন আপনি নিজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখেছেন। যেহেতু বড়ো হয়েছেন, তাই সন্তানের উপর এমন বিশ্বাস আশাটা ভুল নয়। এখন আপনি হাতের মোবাইল ফোনে নানান মজার অনুষ্ঠান দেখতে পাচ্ছেন। তাই মা-বাবার সাথে বসে নিয়ম করে টেলিভিশন দেখেন না। ধরেই নিলাম আপনি কোনো খারাপ বিষয় নয়; বরং বিনোদন মূলক নাটক বা সিনেমা দেখেন। কিন্তু দিনে দিনে ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে, এখন আপনি নিয়মিত সারা রাত জেগে থেকে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখেন এবং ভোর রাতে ঘুমুতে যান, আর যখন পরিবারের অতি আপনজন সকালের নাস্তা করতে টেবিলে বসে আপনার অপেক্ষা করেন তখন আপনি গভীর ঘুমে। তখন কি আর বলা যায় যে ওই মোবাইল বা ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইস আর আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে? না; বরং তখনই বুঝতে হবে যে, আপনার নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে ওই যন্ত্র এবং অনুষ্ঠানের হাতে। এর অর্থ হলো আপনি বড়ো হয়ে স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সংরক্ষণ করতে পারেন নি; বরং তা হারিয়ে ফেলেছেন। এ হলো আপনার বড়ো হয়ে ওঠার এক ব্যর্থতা। আর সেই সাথে আপনি আপনার মা-বাবাকেও ব্যর্থ করে দিলেন যা আপনার দ্বারা আপনার নিজের ও পরিবারের ক্ষতি।

তরুণ বা তরুণী আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সংরক্ষণ কিভাবে হারায় সে বিষয়ে একটি উদাহরণ হতে পারে প্রেম ও বিয়েতে নেশাগ্রস্থের ন্যায় আসক্তি। ধরুন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সহপাঠী বা প্রতিবেশী কোনো একজনের প্রেমে পড়েছেন। প্রেম চলছে এমতাবস্থায় ছেলে কিংবা মেয়ে কোনো একজন তার পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের পছন্দের এবং বিভিন্ন সুবিধার পাত্র বা পাত্রীকে বিয়ে করে ফেলেছে। এরূপ ক্ষেত্রে যদি ওই প্রেমিক জুটির অপরজন তার প্রেম ব্যর্থ হয়েছে মনে করে নিজে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে পরিবারের স্বপ্ন ভুলে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে, তখনই বলা যায় যে, ওই প্রেমিক বা প্রেমিকা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, যা কোনো ভাবেই একজন সচেতন ছেলে বা মেয়ের পক্ষে উচিত কর্ম নয়।

অনেক সময় এমনও হয় ছেলেটি বড়ো হয়ে মা-বাবার দেখানো পথে তাদের কষ্টের গড়া সিঁড়ি বেয়ে যখন নিজে সাবলম্বী হয়ে যায়, তখন আর মা, বাবা, ভাই-বোনকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজে কোনো মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে একা বিয়ে করে ফেলে, তখনও বলা যেতে পারে তার আর্থিক সাবলম্বন তাকে নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলেছে। তাই সে পরিবারকে পাত্তা না দিয়ে তার পিছনে তাদের ত্যাগের কথা ভুলে তাদেরকে না জানিয়ে এমন কাজ করে সে প্রমাণ দিয়েছে যে, সে বড়ো হয়েছে ঠিক-ই; কিন্তু আত্ম নিয়ন্ত্রণ সংরক্ষণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, তা চলে গেছে ওই মেয়েটির কব্জায়। এভাবে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে সে পুরো পরিবারকে সমাজের কাছে ব্যর্থ করে দিয়েছে।

কখনো কখনো দেখা যায় আদরের মেয়েটি আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কোনো ছেলের হাত ধরে পালিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে এবং পরিবারকে অপমানিত করে গভীর কষ্টে ফেলে দেয়। যখন সে বুঝতে পারে তখন অনেক অঘটন ঘটে যায়, যা তার পরিবারকে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। তাই প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর উচিত বড়ো হওয়ার পাশাপাশি আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা ও সংরক্ষণ বিষয়ে দৃঢ় জ্ঞান রাখা।

আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা হারিয়ে বড়োরাও পরিবারকে লজ্জায় ফেলে দেয় নানান ভাবে। অনেকে অবৈধ টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে পুরো পরিবারকে অশান্তিতে ফেলে দেয়। দেখা যায় অবৈধ আয়ের পিছনে ছুটতে ছুটতে কেউ কেউ নেশাগ্রস্থের ন্যায় কেবল টাকা জমায় সারা জীবন; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা পায় না। একসময় সমাজের মানুষ সরাসরি না বললেও আড়ালে থেকে ঠিক বলে ওই লোকটি সুদখোর বা ঘুষখোর বা দুর্নীতিবাজ। এতে করে প্রচুর টাকা হলেও সমাজ ওই পরিবারকে প্রকৃত সম্মানের চোখে দেখে না। এমন বদনাম থেকে যায় বহু যুগ। এটিও ওই লোকের জন্য ব্যর্থতা। কারণ লোকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অবৈধ টাকার হাতে। সেক্ষেত্রে তার পরিবারের সচেতন অন্য সদস্যরাও প্রকাশ না করলেও ভিতরে ভিতরে কুন্ঠিত (লজ্জিত) থাকে। আর এজন্যেই প্রত্যেকের আত্ম- নিয়ন্ত্রণ সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতন থাকা দরকার।

সমাজের নেতৃস্থানীয় ও নীতি নির্ধারকদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়ানো ও তা সংরক্ষণের যোগ্যতা বেশি বেশি থাকা জরুরী। কেননা, জাতির দুর্যোগকালে তাদের নেয়া সিদ্ধান্তের উপর-ই জাতির নিরাপদ জীবন যাপন অনেকটা নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখালে কার্যত তা জাতির ব্যর্থতা হয়, দেশ ব্যর্থ হয়ে যায় বিশ্বের কাছে। দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ঘূর্ণীঝড়, মহামারী, পররাষ্ট্র কর্তৃক সীমান্ত হামলা, দেশে ঘুষখোর দূর্নীতিবাজদের প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি বিষয় রাজনীতির আওতাভুক্ত। কাজেই এসব ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারকদের আবোল-তাবোল কথা বলা ও ক্ষণে ক্ষণে হযবরল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জাতিকে হযবরল অবস্থায় ফেলে দেয়া নীতি নির্ধারকদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা হারিয়েছে প্রমাণ করে। নভেল করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে লক ডাউন বিষয়ে একেকবার একেক সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে এক এলোমেলো পরিবেশ লক্ষণীয়, যাতে সচেতন মানুষ আতঙ্কগ্রস্থ। আমি মনেকরি যারা এ ধরনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবেন, তাদেরকে আগে থেকেই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা অর্জন করতে হয় এবং দিনে দিনে তা সংরক্ষণের যোগ্যতা বাড়িয়ে প্রয়োজনে প্রয়োগ করে প্রমাণ করতে হয়। আর এভাবে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলেই খাদ্য-ব্যবস্থা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, চিকিৎসা-ব্যবস্থা, অর্থনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হবে। অন্যথায় সবকিছুতেই অব্যবস্থা চোখে পড়বে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভগ্নদশা পরিস্কার ফুটে উঠবে জনসম্মুখে। তখন-ই নেতৃত্ব ব্যর্থ হবে, জাতি ও দেশ ব্যর্থ হবে। অতএব সফলতার জন্যে চাই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা অর্জন সংরক্ষণ ও কার্যকর প্রয়োগ।

প্রিয় পাঠক, আলোচ্য বিষয়ের গুরুত্ব এরচেয়ে সহজ ভাবে প্রকাশ করার জ্ঞান আমার জানা নেই। আশাকরি মূলকথাটি তুলে ধরতে পেরেছি। এখন বিষয়টি উপলব্ধিতে আসতে পারে যদি এই লেখাটি একাধিকবার পড়েন এবং নিজেকে, পরিবারকে ও জাতিকে চোখের সামনে নিয়ে ভাবেন। বড়ো হওয়ার পাশাপাশি আমাদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা ও তা সংরক্ষণের যোগ্যতা অর্জিত হোক। সকলের মননের বিকাশ ঘটুক।।

# লেখক কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক।