আজিজ আহমদ সেলিম আপাদমস্তক উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন

বেলাল আহমদ চৌধুরী:

১৮ অক্টোবর প্রথিতযশা সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিমের মৃত্যু সংবাদ শুনে অনেকের মতো আমিও শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ি। গভীর অনুরাগে শেষবারের মত মৃতদেহ দেখার জন্য তার পৈত্রিক নিবাস সিলেট মহানগরস্থ মজুমদারী মহল্লায় ‘রিতা’ কুঠির বাসায় ছুটে যাই। বাসার আঙ্গিনায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশবাহী গাড়ীর ভিতরে নিথর দেহ শুভ্র কাফনে ঢাকা। এ-এক নিদারুণ ট্রেজেডী। আপনজনের উপস্থিতিতে বিষাদের গুঞ্জন। লাশবাহী গাড়ীর কাঁচের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে মনে হলো মানুষের স্বল্প আয়ূর একটি নৈরাশ্যজনক সীমাবদ্ধতা। “কুল্লুনাফসিন যায়িকাতুল মাউত”। অর্থাৎ সকল প্রাণীই মরণশীল। মৃত্যুকে ঠেকাবার জন্য বর্তমান দুনিয়ায় জ্ঞান বিজ্ঞানের সাহায্যে নিরন্তর চেষ্টা সাধনা চলছে। কিন্তু কোন দর্শন বা বিজ্ঞান মৃত্যু ঠেকাবার সন্ধান আজ অবদি আবিষ্কার করতে পারেনি। মৃত্যু নামক ‘রূহ’ অধরা থেকেই যাবে।
সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিম এই সীমাবদ্ধ আয়ূর জীবনকে কর্মের মাধ্যমে বৈচিত্রমণ্ডিত করে তুলতে পেরেছেন বলে মানুষের হৃদয়ে আসন লাভ করেছেন। তাঁর শুভ্র মুখখানা দেখে মনে হলো তাঁর কর্মের সাফল্যের তৃপ্তির বহি:প্রকাশ। জ্ঞানী মানুষের মৃত্যু নেই। তাঁরা বেঁচে থাকেন প্রতি প্রাতে পুলকিত দিনের মতন। সেলিম ভাই নিজের গলায় জড়িয়েছেন ভালবাসার মালা। এমন কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।
আজিজ আহমদ সেলিম আপাদমস্তক উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন। সকল মত ও পথের সাংবাদিক, লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাভান। সত্য কথনে ও লিখনে তিনি ছিলেন নির্ভীক আত্মশক্তিতে বলীয়ান। তাঁর আচার আচরণে চাল চলনে পারিবারিক ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন উদার অমায়িক, নিরভিমান, বন্ধুবৎসল, নিরহংকারী ও সদালাপী। তিনি শিশু সুলভ সারল্য নিয়ে সবাইকে সকল কাজে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তিনি ছিলেন ঐতিহ্য সচেতন সুরুচি সম্পন্ন অভিজাত পুরুষ।
আজিজ আহমদ সেলিম জীবনের প্রতিটি ধাপে পরজ্ঞমতা দেখিয়েছেন। তিনি সকল মহলের ভালবাসায় সিক্ত। সত্যনিষ্ঠ ও আদর্শের পথচলায় তিনি ইস্পাত কঠিন অবিচল ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী। তিনি সুশিল মননের অধিকারী সজ্জন লেখক। তিনি অত্যন্ত সচেতন ভাবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সত্যনিষ্ঠ তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সর্বোপরি সেলিম ভাই একজন অনুসন্ধিৎসু, সত্যনিষ্ঠ, বুদ্ধিদীপ্ত সাংবাদিক লেখক ও সংগঠক ছিলেন।
আজিজ আহমদ সেলিম সিলেট প্রেসক্লাবের দু’বার সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিলেট প্রতিনিধি, সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরীর সম্পাদক, পরবর্তীতে দৈনিক উত্তরপূর্ব পত্রিকার প্রধান সম্পাদক, নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ সিলেট শাখার সভাপতি, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্রাক্তন সহ-সভাপতি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট শাখার আজীবন সদস্য, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সিলেট ও শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাহী পরিষদের সদস্যসহ ক্রীড়া লেখক সমিতির সহ সভাপতি ছিলেন। প্রতিটি স্থানে কর্মই তাঁকে মহিমান্বিত করে তুলেছে। কাজই জীবন, কাজই আনন্দ। কাজেই বেঁচে থাকার প্রমান। তিনি জীবদ্দশায় সমাজের ভাল কাজ করে সুখস্মৃতির উদ্ভব করেছেন। তিনি সুশিল সমাজের স্মৃতির মন্দিরে দীপ্তমান আলোকবর্তিকা।
আজিজ আহমদ সেলিম-এর পূর্ণ নাম আবু উবায়েদ আজিজ আহমদ চৌধুরী সেলিম। ১২ মে ১৯৫৪ সালে পিতা উবায়েদ আহমদ চৌধুরীর ঔরসে মাতা মোছাম্মৎ মেহেরুন নেছা চৌধুরী রিতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী (বড় বাড়ী) গ্রামে। তিনি ছিলেন ৩ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে জৈষ্ঠ।
আজিজ আহমদ সেলিম সিলেট মহানগরের দুর্গাকুমার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে দি এইডেড বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে কৃতিত্বের সাথে আই এস সি পাশ করেন। একই বৎসর সরকারী কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পট পরিবর্তনের পর ১৯৭৬-এর গোড়ার দিকে তৎকালীন সরকারের হয়রানীমূলক কারণে বিদ্যাপীঠ পরিবর্তন করে সিলেট মদন মোহন কলেজে বি কম ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু শারিরীক অসুস্থতার কারণে ডিগ্রী অর্জন সম্ভব হয়নি।
আজিজ আহমদ সেলিম ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালে মুরারী চাঁদ কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। সাংবাদিক সেলিম ১৯৬৭ সালে দি এইডেড বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিকী ম্যাগাজিনে ‘বলাকার ডানা’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। তিনি চাঁদের হাট, শাপলা-শালুকের আসর, ভোরের আলো, সাহিত্যগোষ্ঠী, সিলেট সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সক্রিয় ছিলেন। সেলিম ভাইর একজন ছড়াকার হিসেবে খ্যাতি ছিল। তাঁর ছড়া বই এর নাম “মিঠা কড়ায় ছন্দ ছড়ায়” সর্বত্র প্রসংশিত হয়েছে। আজিজ আহমদ সেলিম একজন ক্রিকেটার হিসাবে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি ১৯৬৯-১৯৮৮ ইং পর্যন্ত সিলেট প্রথম বিভাগ লীগে ইউনাইটেড ক্লাব, স্পোটিং ক্লাব, অগ্রগামী ক্লাব, ইয়ং ডিক্টর ক্লাব, ইয়ুথ সেন্টার ক্লাব -এর প্লেয়ার ছিলেন। তিনি ১৯৮৫ সালে ক্রিকেট আম্পায়ার পরীক্ষায় বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন বিভিন্ন সংস্থা থেকে। তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের সাবেক স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী এমপির সাথে যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেছেন।
পৃথিবীতে মানুষ আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু কয়জন দাগ বা পদচিহ্ন রেখে যেতে পারে? পদচিহ্ন ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ হতে পারে তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের সেলিম ভাই পদচিহ্ন আঁকা পথের পথিক হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখক : কলামিস্ট।