শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী ফজলুল হক তানু মিয়া

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল
ফজলুল হক তানু মিয়া একজন শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও সাদা মনের মানুষ ছিলেন। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সমাজসেবায় তাঁর সৃজনশীল কর্মকা- এলাকার মানুষের কাছে তাঁকে একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ঈমানদার, পরহেজগার ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। সারাটি জীবন তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। কর্মবীর ও সফল সংগঠক হিসেবেও সুধীজন ও সুশীল সমাজের কাছে ছিল সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা।
বহুমুখী কর্মধারার ব্যক্তিত্ব ফজলুল হক তানু মিয়া সিলেটের ঐতিহ্যবাহী গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এম এ রাজ্জাক এবং মাতা মস্তুরা বিবি। কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতাকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ দি এইডেড হাইস্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দী সেখানে পাঠ দান করেন। দেশে-বিদেশে তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী ছড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে গড়া এসব শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন এবং সমাজ ও দেশের জন্য নিয়ে আসছেন অব্যক্ত সম্মান ও মর্যাদা। ফজলুল হক তানু মিয়া শুধুমাত্র শিক্ষকতা পেশায়ই নিজেকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রাখেন নি। মানুষকে কিভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে তোলা যায় সেই ব্যাপারেও চিন্তা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে মানুষের অন্তরের বিকাশ সাধন হয়, মননশীলতার স্ফুরণ হয়। ভেতর থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয়। একটি আদর্শিক ও সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য গ্রন্থ পাঠ তথা শিক্ষার বিকল্প নেই। সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ এবং মানুষকে পরিবর্তন করার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি শাহজালাল লাইব্রেরি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। বিগত ৬৪ বছর ধরে তাঁর এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষা-সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
ফজলুল হক তানু মিয়া একজন সফল সংগঠকও ছিলেন। কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সততা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন পুস্তক ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি ছিলেন ঐক্যবদ্ধতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি এবং সহযোগিতার মূর্ত প্রতীক। ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করার দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। এজন্য আশির দশকে ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের পুস্তক ব্যবসায়ীদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সিলেট জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এই সমিতির মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশের পুস্তক ব্যবসায়ীদের মধ্যে অটুট সম্পর্কের সূচনা করেন। সমগ্র বাংলাদেশের পুস্তক ব্যবসায়ীদের মধ্যে তিনি একটা সম্মানজনক স্থান দখল করে নেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতার স্মারক জিন্দাবাজার পয়েন্টে ‘শাহজালাল লাইব্রেরি’। এটা তাঁর জীবনের পরম পাওয়া এবং সাফল্যও বটে।
সুশিক্ষাই একটি জাতি নির্মাণের সহায়ক। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হয় না। শিক্ষাই আদর্শ মানুষ তৈরি করেÑএই দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন ফজলুল হক তানু মিয়া। তাই প্রায় অর্ধ শতাব্দী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেই নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি শিক্ষার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। তিনি দীর্ঘদিন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রসময় মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়াও ফজলুল হক তানু মিয়া জীবদ্দশায় অনেক মাদ্রাসা, মসজিদ এবং স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যা তাঁকে একজন কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের সম্মান দিয়েছে।
আলহাজ্ব ফজলুল হক তানু মিয়া শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের পাশাপাশি ছিলেন একজন আদর্শ সমাজসেবক। ব্যক্তিত্বের নৈতিক দাবি হিসেবে তিনি এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবসময় সামনে থেকে কাজ করেছেন। সমাজের অসহায়-দুস্থ-গরিব-ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী। কারো দুঃখ-কষ্ট দেখলে তিনি কষ্ট পেতেন। অবিবাহিত যুবক-যুবতীদেরকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দিতে তিনি ভূমিকা রাখতেন। সমাজে যাতে অন্যায়-অবিচার কিংবা অশ্লীলতা ছড়িয়ে না পড়ে এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন সজাগ ও যথেষ্ট সচেতন। তাঁর সামগ্রিক জীবনই বলে দেয়, তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন মানবদরদী ছিলেন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কর্মের তাগিদে সবসময় শহরে অবস্থান করলেও এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। যার কারণে তাঁর প্রতি এলাকার মানুষের ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। এজন্য সাধারণ জনগণের প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনায় তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করা হয়। জনগণের বিপুল উৎসাহ, ভালোবাসা ও সম্মান নিয়ে তিনি ভাদেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অত্যন্ত বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা, সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতার সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় আটারো মাস দায়িত্ব পালনকালে সবসময় জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। একটি নির্দিষ্ট ইউনিয়নে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করলেও উপজেলার যেকোনো জায়গায় সমস্যা দেখা দিলেই তিনি চলে যেতেন এবং সাধারণ জনগণের সমস্যা সমাধান করতে চেষ্টা চালাতেন। যার ফলাফল তিনি পেয়েছেন জীবদ্দশায়। এরমধ্যে চলে আসে উপজেলা নির্বাচন। সর্বস্তরের জনগণের ইচ্ছে তাঁকে গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সর্বস্তরের জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। এলাকার মানুষের কাছে তিনি কতটা জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য ছিলেন এখান থেকেই সহজেই অনুমেয়।
ফজলুল হক তানু মিয়া একজন স্বাপ্নিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে খালিস-মুখলিস দাঈ হিসেবে কাজ করেন। দ্বীনের কাজে সর্বদা অগ্রবর্তী ছিলেন। নিজেকে একজন আদর্শ ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ইসলামই মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ। ইসলাম বিশ্বমানবতার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। আর আল্লাহ তায়া’লা ইসলামের বাহক বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-কে উত্তম এবং অনুপম চরিত্র দিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ চরিত্রের সংস্পর্শে দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে অসভ্য মানুষগুলো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হন। তাদের মত ব্যক্তিত্ব আর পৃথিবীতে কেউ আসবে না। বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের মাধ্যমে একটি আদর্শ, সোনালি এবং কল্যাণ রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। যা আজো পৃথিবীর মানুষের জন্য নমুনা হয়ে আছে। তাঁর আনিত জীবনব্যবস্থা ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমেই দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। ফজলুল হক তানু মিয়া বিশ্বাস করতেন, ইসলাম ব্যক্তি বিশেষে পালনীয় কিছু বিধিবিধানের নাম নয়। বরং তা পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তি জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে ইসলাম। সর্বক্ষেত্রে এর বাস্তবায়নেই পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এর জন্য ইসলামী আইন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এই দর্শন-চিন্তায় বিশ্বাসী ফজলুল হক তানু মিয়া আমৃত্যু একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। একটি আদর্শ ও সাম্যের সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সর্বদা সোচ্চার।
বহুগুণে গুণান্বিত ফজলুল হক তানু মিয়া ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে একটি আকস্মিক দুর্ঘটনায় কোমরের হাড় ভেঙ্গে যায়। তিনি শয্যাশায়ী হয়ে যান। জীবনের পড়ন্ত সময়গুলো তিনি অতি কষ্টে যাপন করেন। প্রায় ৬ বছর ৮ মাস ৫ দিন শয্যাশায়ী থেকে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি রোববার ৯.৪০ মিনিটে সিলেট নগরীর একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। পারিবারিক জীবনে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও পাঁচ কন্যাসন্তান সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ১১ জানুয়ারি সোমবার বাদ জোহর সিলেট শহরের জল্লারপার জামে মসজিদে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁকে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। আল্লাহ তায়া’লা তাঁর নেককর্ম সমূহ কবুল করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসের বাসিন্দা হিসেবে কবুল করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক।