লালুর ভালোবাসা

কবির মাহমুদ :
আজ থেকে চার বছর পূর্বে এই দিনে ভোর সকালে লালুর জন্ম হয়। আজ লালুর চার বছর পূর্ণ হলো। জন্মের সময় খুব স্বাস্থ্যবান ও টকটকে লাল বর্ণের ছিল বলেই শিমুল তার নাম রেখেছিল লালু। আজ শিমুলের মা বাবাও লালু বলে ডাকেন। লালুকে সবাই ভালোবাসেন। যে মায়ের সামনে লালুকে কেউ স্পর্শ করতে পারেনি।
আজ লালুও জানে না তার মা কোথায়!
শিমুলদের কাছে লালুই, লালুর মায়ের শেষ সন্তান! দুই বছর গত হলো, লালু তার মাকে দেখেনি। মাঝে মধ্যে যখন করুন সুরে ডাকে তখন শিমুলের খুব কষ্ট হয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে আমি আমার মায়ের কাছে কত্তো আদরের! আজও আমার মা আমাকে আদর করে মুখে তুলে খাবার খাইয়ে দেন। সেও তাই ছিল। পৃথিবীতে যতো প্রাণী সকল প্রাণীই তার সন্তানকে খুব ভালোবাসে। সন্তান আর মায়ের ভালোবাসা এক অদ্ভুত সৃষ্টি।
আজ থেকে দুই বছর পূর্বে টাকার বিনিময় শিমুলের বাবা লালুর মাকে অন্যত্র দিয়ে দেন। লালুর বয়স তখন দুই। লালুর ভাই বোনদের জন্মের পর লালুর মা প্রতিদিন ৫ লিটার করে দুধ দিয়ে যেত শিমুলদের। কিন্তু আজ আর গায়ে সেই জোর নেই। দিনদিন শুকিয়েও যাচ্ছিল। লালুর জন্মের পর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি লালুর মা।
আর কিভাবেই বা রাখবে। সময় আর বয়স তো জীবন যৌবনের অপেক্ষায় বসে থাকে না। তাই যখন শিমুলের বাবা বুঝতে পারলেন লালুর মাকে দিয়ে আর কোনো কাজ হবে না। হঠাৎ একদিন শিমুলের মাকে বলেন- শুনো শিমুলের মা- লালুর মা তো বুড়ো হয়ে গেছে আর আগের মতো কাজ করতে পারে না!
দিনদিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আগের সেই চঞ্চলতাও নেই। তাই ভাবছিলাম, ছাড়িয়ে নিই কিছু টাকা পাওয়া যাবে।
শিমুলের মা হাজেরা বানু কথাটা শুনে তার বুকটা ধক করে ওঠে। ওগো তুমি না বলেছিলে, আমাকে যখন প্রথম লাল শাড়িতে ঘরে তুলেছো, তখন এই লালুর মায়ের দুধে চিনি মিশিয়ে আমাকে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলে।
আজ একটা যুগ পেরিয়েছি লালুর মাকে যতন করে করে। এক কাজ করো না –
যতোদিন বাঁচে বাচুক না আমাদের মাঝে। ভালোবাসার বন্ধনে রেখে দাও।
তোমার কথায় আমি এতোটা টাকা ছাই করবো বলে ধমক দিয়ে উঠেন স্বামী চঞ্চল!
মন খারাপ করে আর কোনো কথা না বলে প্রস্থান করলেন হাজেরা বানু।
পরদিন ভালো করে গোসল করিয়ে লালুর মাকে নিয়ে চলে গেলেন চঞ্চল।
হাজেরা বানুর মনে এক সাগর কষ্টের ঢেউ উতালপাতাল করছে। অনেক দিনের লালিত লালুর মাকে বিদায় জানাতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন হাজেরা। খুব ভালো করে লবন মিশিয়ে শেষ খাবার দিলেও কোনোকিছু মুখে না নিয়ে লালুর মায়ের চোখ দিয়ে টলটল করে অশ্রু ঝরতে দেখছেন হাজেরা বানু।
অশ্রুঝরা চোখে কষ্টভরা কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে হাজেরা বানুর করুন সুরও চঞ্চলের মনে নাড়া দিতে পারেনি। দেখো না গাভীটি খুব কাঁদছে। হয়তো সেও চাচ্ছে না এই মায়া ভালোবাসা ছেড়ে নতুন কোথাও যেতে। কিন্তু, কথা বলতে পারছে না বিদায় তার মনের কষ্টটা তোমায় বলতেও পারছে না।
তোমার টাকার প্রয়োজন হলে আমার
দুটি বালা বিক্রি করে নাও। তবু গাভীটি বিক্রি করো না, বলেই যাচ্ছেন হাজেরা বানু।
হাজেরার কথায় কান না দিয়ে ঠিকই গাভীটিকে বাজারে নিয়ে গেলেন চঞ্চল।
একজন খুব দেখেশুনে দরদাম কষিয়ে
নিয়েও গেলেন লালুর মাকে। চঞ্চল, টাকা গোনে মনের সুখে বাড়ি ফিরলেন। বাড়িতে এসে স্ত্রী হাজেরাকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। আজকের লালু তার সেই দুখিনী মায়ের পথে দাঁড়িয়ে। প্রচুর টাকার সন্ধানে আজও শিমুলের বাবা বিক্রি করে দিতে চান লালুর মায়ের মতো লালুকেও। এদিকে শিমুল কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে লালুর ভালোবাসায়। অদৃশ্য গন্তব্যের দুশ্চিন্তা লালুকে আজ গ্রাস করেছে। লালুও আজ দুইদিন যাবত কিছুই খাচ্ছে না! মায়ের মতো অনবরত অশ্রু ঝরিয়ে যাচ্ছে দু’চোখে।