রাজার বাড়ির পাশেই চোরের বাস

মোহাম্মদ আব্দুল হক

আমি আমার স্ত্রী নিয়ে হাসপাতালে আছি। তিনি অসুস্থ আছেন। সবাই দোয়া করবেন। আর্থিক সামর্থ্য খুব ভালো নেই সেই ২০১০ খ্রীষ্টিয় সালের শেয়ার বাজারে ভয়ংকর কেলেংকারী হয়ে যাওয়ার পর থেকেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ওই শেয়ার কেলেঙ্কারির বিষয়ে সঠিক বিচার করবেন, এমন আশায় আমরা প্রায় এককোটি বিনিয়োগকারী অপেক্ষায় ছিলাম এবং এখন পর্যন্ত আমরা এককোটি ভোটারের পরিবার আশায় বেঁচে আছি। নিজের এমন অবস্থায় হয়তো কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা ছিলো ; কিন্তু আমি তা পারি না। যখনই শুনি কোথাও অনাচার তখনই ক্ষোভ দানা বাঁধে এবং কলম নিয়ে খাতায় লিখি অথবা আঙুলের ছোঁয়ায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসে লিখি মনের কথা। এখানে হাসপাতালে থেকে যখন শুনি পুলিশ ঘুষ না পেয়ে এদেশের নাগরিককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে তখন চুপ থাকতে পারি না। কারণ আমি শুধু খাওয়ার জন্যে এই পৃথিবীতে আসিনি। মরবেতো সকলেই, তবে মানুষ হিসেবে মনুষ্য সমাজে পশুর মতো নয়, মানুষের কিছু কর্তব্যের কথা মনে রেখে জীবন যাপন করতে হয়।

আমাদের প্রবাসী ভাই ও বোনেরা রেমিট্যান্স পাঠায়। তাতে দেশের রিজার্ভ ফুলে ফেঁপে বেড়ে উঠে। দেশে ও বিদেশে হৈ হৈ রব ওঠে বাংলাদেশ আর গরীব নয়, বাংলাদেশ এখন ধনী দেশ। আমাদের কোনো কোনো মন্ত্রী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে হাওয়ায় হাওয়ায় সার্টিফিকেট প্রদান করেন, বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুর বা কানাডা হয়ে গেছে। এদিকে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ রাজাদের মতে ধনী হলেও এদেশের সাধারণ মানুষ পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার পায় না। নূন্যতম চিকিৎসা সুবিধা পায় না। ন্যায় বিচার পায় না। তবে হ্যাঁ, সরকারি লোকেরা রেশন পায়, বেতন পায় এবং ওরা-ই মাসের প্রাপ্ত বেতনের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি শুধু সংসারে ব্যয় করে। এছাড়াও তারা পাঁচ-দশ বছরের চাকরি জীবনেই গাড়ি, জায়গা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি কিনে ফেলে স্ত্রী, বোন কিংবা শ্বশুর- শাশুড়ির নামে।

এখানে পুলিশ আছে কিন্তু জনগণের নিরাপত্তা নাই ; বরং কখনো কখনো পুলিশ নিজেই জনগণের নিরাপত্তা হরণ করে এবং মানুষকে মেরে ফেলে। কক্সবাজারে ওসি প্রদীপ গং রা সিনহাকে মেরে ফেলেছে, সিলেটে এসআই আকবর গং রা রায়হানকে নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলেছে।

এদেশে সড়ক ও জনপথ বিভাগ আছে, আছে প্রকৌশলী ও সহযোগী কর্মকর্তাগণ। কিন্তু বাংলাদেশের সড়কের বেহাল দশার কোনো স্থায়ী উন্নতি হয় না। বারোমাস বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবু বারোমাস ভাঙা সড়কের উপর দিয়ে এদেশের সাধারণ পরিবহন হেলেদুলে ও ঝাঁকুনি খেয়ে যাত্রী নিয়ে চলে। তবে হ্যাঁ, প্রকৌশলীদের কিন্তু ভঙ্গুর অবস্থা আর থাকে না। তাদের হয়ে যায় গাড়ি, ফ্ল্যাট, আলাদা জায়গায় বহুতল ভবন।

এদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড আছে এবং বাংলাদেশের নদী রক্ষা ও হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষার জন্যে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। মানুষ তাদের শেষ আশ্রয় ভিটা মাটি হারিয়ে হয়ে যায় সর্বহারা। হাওরাঞ্চলের মানুষ প্রতি বছর কষ্ট করে চাষ করে ফসল ফলায়। কিন্তু হাওর রক্ষা বাঁধের জন্যে বরাদ্দকৃত টাকা প্রকৌশলীদের যোগসাজশে ঠিকাদাররা হিসেবে গরমিল দেখিয়ে লুটপাট করে তাদের পকেটস্থ করে। অতি বৃষ্টির কারণে কিংবা বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। কৃষকদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ভারী বাতাস সবসময় গিয়ে দেশের রাজধানীতে বসে থাকা প্রিয় জনদরদী কোনো নেতা বা নেত্রীর কানে পৌঁছে না। হাওর উন্নয়নের জন্যে বরাদ্দকৃত টাকায় ফসল রক্ষার জন্যে মূলত কাজের কাজ কিছুই হয় না। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের প্রায় সকলের ব্যক্তিগত উন্নয়ন ঠিক-ই হয়ে যায়। প্রকৌশলীরা রাজধানীর রাজার বাড়ির পাশেই গুলশান, বনানী, বারিধারা, আদাবর এবং দেশের বিভিন্ন শহরে স্থায়ী আবাস হিসেবে ফ্ল্যাট একটি, দুইটি বা তারও অধিক করে ফেলেন। বছরের পর বছর হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার কারণে কৃষক তার ছেলেকে আর কলেজে পড়াতে পারে না, মেয়েকে সময়মতো ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারে না, স্ত্রী কিংবা নিজে অসুস্থ হলে টাকার অভাবে সাধারণ চিকিৎসা সুবিধা পায় না ; কিন্তু ওই কৃষকদের ফসল রক্ষার টাকা মেরে দিয়ে প্রকৌশলীরা ঠিক-ই তাদের বাচ্চাদের দামী স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, কেউ কেউ বিদেশেও পাঠিয়ে দেয়।এদের খবর আশেপাশের মানুষের জানা আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন নিশ্চয়ই জানে। আমি বুঝি না, সবসময় দুর্নীতি দমন কমিশন কেন কারো অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকবে? ওই কমিশন নিশ্চয়ই জানে কোন প্রকৌশলীর বেতন কতো। তাহলে দুদক কি স্ব প্রণোদিত হয়ে ওইসব প্রকৌশলীদের সম্পদের হিসাব চাইতে পারে না?

আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কথা এখন এক মহা আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ এবং সারাবিশ্বে। কোভিড-১৯ এর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে সরকার নিজেই বুঝে গেছে আমাদের স্বাস্থ্য খাত কতোটা নাজুক পরিস্থিতিতে আছে। অথচ এ খাতে বাংলাদেশের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতি বছর। আর প্রতি বছর লুটপাট হয়েছে ইচ্ছেমতো। লুটপাট কি হয়েছে তার হিসাব করার সাধ্য আমার নাই। তবে দেশবাসীর জানা হয়ে গেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়ির চালক লুটেপুটে এমন খেয়েছে যে, সে শুধু রাজধানীর রাজা ও উজীরদের বাড়ির পাশেই বহু ফ্ল্যাট, ভবন, খামার ইত্যাদি গড়ে তোলেছে।

কোন বিভাগ নিয়ে কথা বলবো! সকল সরকারি অফিসের এক-ই চিত্র। কেবল লুটপাট আর লুটপাট।

আমি কিছুই করতে পারি না। রাগে ক্ষোভে শুধু লিখি – তুমি চোর!

দেশের মানুষ খাজনা দেয়। তোমরা সেই টাকায় বেতন পাও। তুমি পুলিশ, হিসাব কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রকৌশলী, পিয়ন কিংবা যেকোনো সরকারি বেতনভোগী কর্মচারী ; তুমি মূলত জনগণ ও দেশের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী, তুমি জমিদার নয়।

এখানে রাষ্ট্রীয় একটি বেতন কাঠামো আছে। এ-যুগে লুকোনোর সুযোগ নাই ; বরং কে কতো টাকা হালাল বেতন বা বৈধ বেতন পাও তা এখন সবাই মোটামুটি জানে। এর বাহিরে তোমার এবং তোমার পরিবারের সদস্যদের পোশাক, দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ও অন্যান্য চলন দেখে এবং ঘরে জিনিসপত্রের আধিক্য দেখে ও সম্পদের খোঁজ পেয়ে, সহজেই মানুষ বুঝতে পারে তুমি চুরি করেছো, ঘুষ খেয়েছো অথবা সরকারি টাকা হিসেবে গরমিল দেখিয়ে নিজের করে নিয়েছো। তোমার ওই টাকা বা সম্পদ হারাম সম্পদ, চুরির সম্পদ, ঘুষের সম্পদ, লুটের সম্পদ। তুমি অবৈধ টাকা বা সম্পদ দিয়ে তোমার সন্তানকে খাওয়াচ্ছো। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আমাদের রাজধানীর রাজার বাড়ির পাশেই অধিকাংশ বড়ো বড়ো চোরদের বসবাস। আশায় আছি, দুদক চেয়ারম্যান এবং আমাদের মহামান্য রাজা মশাই চোরদের ধরে সায়েস্তা করবেন।

আমি অতি সাধারণ। তবে আমার ভোটটি কিন্তু অসাধারণ। এই ভোটেই রাজা ঘটে আবার এই ভোটেই রাজা হটে। আমি এরচেয়ে বেশি কিছু করতে পারি না। শুধু ধিক্কার জানাই আর লিখি – তুমি চোর তুমি চোর তুমি চোর।

কলামিস্ট ও কবি