যুক্তরাজ্যে লকডাউনের এক বছর শশ্রুমন্ডিত জীবনে যেভাবে পথচলা…

প্রবন্ধ প্রবাস

তাইসির মাহমুদ :
আজ তেইশ মার্চ ২০২১। যুক্তরাজ্যে লকডাউন শুরু হওয়ার এক বছর । গত বছরের তেইশ মার্চ জাতীয় লকডাউন শুরু হয়েছিলো। আজ এক বছর পার হলেও লকডাউন শেষ হয়নি। কবে, কখন শেষ হবে নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। সরকার আশা করছে ২১ জুন লকডাউনের সকল বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হবে।
গত বছরের মার্চ মাসে হঠাৎ প্রবল বেগে ধেয়ে এসেছিলো মরণব্যাধী করোনা । এক বছরে ১ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিলো এই কঠিন মহামারি । কত স্বজন, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতজনকে আমরা হারিয়েছি । আমরা অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়েছি। কঠিন সময় পার করেছি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে এসে এখনও বেঁচি আছি। সমস্ত প্রশংসা মহান মালিকের, যিনি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষের জন্য আমাদের মন কাঁদে । এক বছরে এত মানুষকে হারাবো- এটা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।
একটি রোগের কারণে সাড়ে ৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশকে দিনের পর দিন লকডাউন করে রাখতে হতে পারে- এমন ধারণা কখনোই ছিলো না । বিশ্ব কি এই লকডাউন প্রক্রিয়ার সাথে আগে কখনো পরিচিত ছিলো? আমার মনে হয় না। ইতিহাসে এরকম কিছু দেখিনি ।
করোনা আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবনকে নানাভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে।
নতুন নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে । এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে দিনের পর দিন লেখা যাবে। আজ আমার জীবনে দাড়ি রাখার প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোকপাত করতে চাই । লকডাউনের বর্ষপূর্তির সাথে সাথে দাড়ি রাখারও এক বছর হয়ে গেলো।
আসলে দাড়ি রাখার কথা ভাবছিলাম অনেক আগে থেকেই । বিশেষ করে যখনই কোনো জানাজার নামাজে যেতাম এবং নামাজ শেষে কফিনে শুইয়ে রাখা মৃত ব্যক্তির দাড়িবিহীন মুখমন্ডল দেখতাম, তখনই বিষয়টি নিয়ে খুব ভাবতাম । মনে হতো এই মানুষটি রাসুলের সুন্নাত নিয়ে মারা যেতে পারলেন না। আমিও তো যেকোনো সময় মারা যেতে পারি । এভাবে যদি মারা যাই তাহলে দাড়িবিহীন মুখে কবরে যেতে হবে। অনেকেই হয়তো আমার দাড়িহীন মুখের দিতে তাকিয়ে আক্ষেপ করবে। বলবে, দাড়ি নেই। কিন্তু জানাজা থেকে ফেরার পর জাগতিক ব্যস্ততা এসব ভুলিয়ে দিতো। আবার যখন কোনো জানাজায় যেতাম তখন ভাবতাম।
২৩ মার্চ লকডাউন শুরু হয়। কিন্তু করোনার ভয়ে দুইদিন আগে থেকেই মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। আমি সর্বশেষ অফিস করি ২০ মার্চ শুক্রবার । ওইদিন হাতেগোনা দুচারটি মসজিদে জুমার নামাজ হয়েছিলো। ইস্ট লন্ডন মসজিদসহ অধিকাংশ মসজিদই আগেরদিন বন্ধ ঘোষণা করা হয় । আমরা মুখোমুখি হই এক কঠিন বাস্তবতার । সন্ধ্যায় অফিস থেকে ঘরে ফিরি। রাত কাটে ভয়ে ভয়ে।
পরদিন সকালে বাথরুমে গেলাম । হাত মুখ ধুয়ে যথারীতি মুখ শেভ করতে রেজার হাতে নিই। আয়নায় মুখ দেখছি। রেজার ঠিকঠাক করছি । হঠাৎ মনে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হলো। আচ্ছা, করোনায় প্রতিদিন শতশত মানুষ মারা যাচ্ছে। আমিও তো যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। যদি মারা যাই তাহলে কবরে নেকির-মনকির ফেরেশতাদের কী জবাব দেবো?
কবরের প্রথম প্রশ্ন: তোমার প্রতিপালক কে? উত্তর হয়তো দিয়ে দিলাম- আল্লাহ। দ্বিতীয় প্রশ্ন-তোমার দ্বীন কী? এটারও উত্তর দিয়ে দিলাম- ইসলাম। তৃতীয় প্রশ্ন: রাসলের চেহারা দেখিয়ে বলা হবে তিনি কে? তখন কি উত্তরটা দিতে পারবো? কীভাবে পারবো? রাসুলকে (সাঃ) তো কখনো দেখিনি। তাহলে তাঁকে কীভাবে চিনবো? তাঁকে চেনার তো একমাত্র উপায় তাঁর আদর্শের অনুসরণ করা, সুন্নাত পালন করা । সুন্নাতগুলোর মধ্যে একটি দৃশ্যমান সুন্নাত হচ্ছে দাড়ি। যদি দাড়িবিহীন মুখে কবরে যাই, তাহলে কি রাসুলকে চিনতে পারবো ? রাসুল কি আমাকে পরিচয় দেবেন?
প্রশ্নগুলো যখন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো তখন রেজারটি গালে না লাগিয়ে খাপের মধ্যে গুটিয়ে রেখে দিলাম । বাথরুম থেকে সোজা নেমে এলাম নিচতলায়। সিটিংরুমে তখন ছেলে মেয়েরা টিভি দেখছে । বললাম, আমি আজ থেকে দাড়ি রাখছি। তোমরা কী মনে করো? তারা একসুরে বললো, “বাবা দাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর মানাবে। এখন তো সকলেই দাড়ি রাখে । দাড়ি রাখা ফ্যাশন।” তাদের কথায় দারুনভাবে উৎসাহিত হলাম। শুরু হলো শশ্রুমন্ডিত জীবনে পথচলা । (চলবে)

তাইসির মাহমুদ
ডেগেনহ্যাম।
পূর্ব লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
২৩ মার্চ ২০২১