মানসিক রোগী (পর্বঃ এক)

মানসিক রোগী লেখিকাঃ সামিরা নাজ

ইদানীং ঘড়ির টিকটিক শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আর অদ্ভুতভাবে তখন ঘড়িতে সময় হয় ঠিক ৩ টা, মাঝে মাঝে ২ টা ৫৫ আবার কখনো ৩ টা বেজে ৫ মিনিট। ঘুম ভাঙতেই আমার প্রথম কাজ বাচ্চা দুটোকে দেখা ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কিনা। ২ মাস হলো বাবুকে খাটে শুয়াচ্ছি। দোলনায় শুয়ালে কান্না করে বেশি আবার খাটেও শুয়াতে ভয় মায়ান কখন বাবুর ওপর হাত পা তুলে দেয়। কি আর করার সেও তো বাচ্চা। বড় কেউ হলে না হয় সতর্ক থাকতো।

কিন্তু মায়ানকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না সে নিজেই ৭ বছরের বাচ্চা ছেলে। এখন থেকেই মিহির খেয়াল আমার চেয়েও বেশি রাখে। আমি বেখেয়ালি হলেও সে মনে করিয়ে দেয় বেলায় বেলায় মিহির খাওয়ার সময় হয়েছে কিনা, মিহির ঘুম পেয়েছে কিনা, পটি পেয়েছে কিনা।

একা হাতে দুই বাচ্চা সামলানো যে কি ঝামেলা। এই সময় সারিদকে সবচেয়ে বেশি মিস করি। সে আজ এখানে থাকলে হয়তো এত কষ্ট হতো না। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারদের মনে হয় পরিবার থাকতে নেই। একবার গেলে ৮-৯ মাসের আগে আর চেহারা পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য হয় না।

গতবার যখন এসেছিল তখন মিহির বয়স ছিল ৭ মাস। এখন মিহি টুকটাক কথা বলে মায়ান ওকে বাবা ডাক শিখিয়েছে, ভাইয়া ডাক শিখিয়েছে। কিন্তু মা ডাক কারো শিখানো লাগে নি। ওর মুখে প্রথম ডাকটাই ছিল মা।

কি জানি সব বাচ্চা মনে হয় প্রথমে মা ই ডাকে। আমি কি ডেকেছিলাম মনে নেই। মা ও কোনোদিন বলে নি কি ডেকেছি কোনোদিন জিজ্ঞেস ও করা হয় নি। আর এখন জিজ্ঞেস করার সুযোগ ও নেই।

মিহিকে আমি যেমন ভালোবাসি আমার মা ও কি আমাকে এতটা ভালোবাসতো? বাসারই কথা। সব মা ই তো তার বাচ্চাকে ভালোবাসে। কিন্তু যদি ভালোবাসতো তাহলে কি ছেড়ে দিতে পারতো?

কি থেকে যে কি চলে আসে মনে। এখন ওসব কথা মনে করে মন খারাপ করতে চাই না। কাল মায়ানের বার্থডে। আশা করি কাল একটা ফোন পাবো। সপ্তাহে ২ দিন ই ফোন করার সুযোগ থাকে, তাই ওই দুই দিন চাতক পাখির মত অপেক্ষা করে বসে থাকি ৩ জন মিলে।

পিচ্চিটাও বাবার ফোন আসলে খুশিতে বাকবাকুম হয়ে যায়। কি বুঝে হয় কে জানে। ওর মনে না থাকলেও মায়ান ওকে বাবাকে চিনিয়েছে, বাবা আপন মানুষ বুঝিয়েছে, বাবাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।

এখন নিয়ম করে শুধু আমি না আমরা ৩ জন ই কথা বলি। মিহিটা এই বয়সেই ফোন কানে দিলে কত কি যে তা তু বলে। কিচ্ছু বুঝা না গেলেও ওর ভালোবাসাটা ঠিক ই পৌছে যায়।

কাল তো ৩ জানুয়ারী।একদম ভুলে গিয়েছিলাম কাল ডক্টরের এপোয়েন্টমেন্ট। না ওরকম কোনো ডক্টর না, সাইক্রিয়াট্রিস্ট। না না আমি মানসিক রোগী না। বাংলাদেশে তো সাইক্রিয়াট্রিস্ট বলতে সবাই মানসিক রোগী মনে করে।

বাসায় কথা বলার মত কেউ নেই। আর মায়ান তো বাচ্চা ওকে সব বলা যায় না, বললেও বুঝবে না। তাই মেন্টাল হেলথ এর উন্নতির জন্য, আর একা একা যেন ডিপ্রেশনে না পড়ে যাই তাই একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট সাজেস্ট করলো এক ফ্রেন্ড।

কিন্তু কাল কিভাবে ম্যানেজ করবো বুঝতে পারছি না। আচ্ছা ইভাকে ফোন করে বলে দেই। সাইক্রিয়াট্রিস্ট ওর ফ্রেন্ড। ও কিছু না কিছু একটা ম্যানেজ করে নিবে।

-কি রে, কি অবস্থা?
-আলহামদুলিল্লাহ,তুই বল। কেমন লাগছে এখন?
-হ্যা ভালো। তোকে একটা দরকারে ফোন দিয়েছি। তুই তো জানিস কাল মায়ানের বার্থডে। আর ওইদিন ই ভুলে ডক্টরের ডেইট পড়ে গেছে। কি করি বল তো?
-ওহ হ্যা। আচ্ছা সমস্যা নেই। তোর চিন্তা করা লাগবে না আমি নেক্সট ডেইট নিয়ে নিব। মায়ান আর মিহিকে আমার পক্ষ থেকে আদর দিস।
-আচ্ছা। তুই কাল ফ্রি থাকবি কখন?
-ফ্রি থাকবো না রে কাল। অফিসে অনেক কাজ জমে আছে। একেবারে রাত নয়টার পরে ফ্রি হবো।
-আচ্ছা তুই যখন ফ্রি হবি তখন ভিডিও কল দিবো।

ভার্সিটিতে যে কয়জন ফ্রেন্ড ছিল এরমাঝে শুধু এই একজনের সাথেই যোগাযোগ আছে। বাকিদের সাথে অজানা কারনে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আসলে স্কুল থেকেই আমার সাথে এই একই ঘটনা। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয় একটা কথা আছে না।

স্কুলে আমরা ৭/৮ জন ছিলাম জিগরী দোস্ত। কিন্তু স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠতে উঠতে তাদের সাথে যোগাযোগ কাট হয়ে গেলো।আবার একই রকমভাবে কলেজের বন্ধুগুলোও ছুটে গেলো ভার্সিটিতে। শেষমেষ এই একটাই বন্ধু আমার।

আসলে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ই আমার জীবনে। এরমাঝে আপন মানুষগুলো ও সাথে নেই। যার জন্য পরিবারের বিরুদ্ধে গেলাম সে তার পরিবারের দেখভাল করতে গিয়ে আর পরিবারকেই সময় দিতে পারছে না।

হ্যা, পরিবার ছেড়েছিলাম ১০ বছর আগে। আমাদের স্ট্যাটাস দেখে ভালোবাসতে হয়, জাত দেখে ভালোবাসতে হয় আর এখানে তো সে অন্য এক ধর্মের! হিন্দু হয়ে মুসলিমকে ভালোবাসা এমন পাপ কি আছে নাকি এ জগতে আর?

এতকিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। ফোনের দিকে তাকাতেই ইভার নাম দেখতে পেলাম পাশে ব্র‍্যাকেটে লিখা সাইক্রিয়াটিস্ট!

এইমূহুর্তে ফোনটা ধরতে ইচ্ছা করছে না, বাজুক কিছুক্ষণ। ভাবলাম একবার বেজে বন্ধ হয়ে যাবে কিন্তু না আবার ও কল আসলো একই নাম্বার থেকে। উপায় না দেখে ধরলাম।

-হ্যালো
-হ্যালো মিলি, কেমন আছো?
-জ্বি ভালো।
-তুমি ফোন দিয়েছিলে। আমি ফোনের কাছে ছিলাম না তাই ধরতে পারি নি।
-হ্যা।
-কোনো দরকার ছিল?
-না।
-কাল দেখা করার ডেইট মনে আছে তো?
-হ্যা।আচ্ছা আমি রাখছি আমার কিছু কাজ আছে।
-আচ্ছা ভালো থেকো, কাল দেখা হচ্ছে।

ফোনটা রেখে কিছুক্ষনের জন্য সব ঝাপসা দেখা শুরু করলাম। কি করছিলাম, কি করবো মনে পড়ছে না। হঠাৎ মনে পড়লো মিহিকে গোসল করাতে গিয়ে এদিকে চলে এসেছি। দৌড়ে বাথরুমে গেলাম। মিহি এখনো পানিতে বসে আছে, পানিতে বসে কাঁদছে।ওকে জলদি টাওয়াল পেচিয়ে তুলে আনলাম।

মিহি কিছুতেই খাবার খাচ্ছে না। ওর গা গরম হয়ে গিয়েছে। এখন ওকে রেখে উঠতেও পারছি না। কত প্ল্যান ছিল কালকের জন্য। কিন্তু এই সময় এই দুর্ঘটনা টা হয়ে গেল। সব দোষ ওই সাইক্রিয়াটিস্ট এর।

মায়ান পাশের বাসায় খেলতে গিয়েছিল। আজকাল হয় মিহির সাথে খেলে নয়তো পাশের বাসার ছেলেটার সাথে খেলতে ব্যস্ত থাকে সারাদিন।

আমি সারাদিন মিহিকে কোলে নিয়ে বসে আছি। মায়ান ও বোনের জন্য টেনশন করছে। রাতে মায়ানকে বলে দিলাম পাতিল থেকে ভাত আর তরকারি বেড়ে খেয়ে নিতে। আমি আর উঠলাম না।

মায়ান ও রাত ১ টা পর্যন্ত জেগে রইলো। সে ঘুমাবে না কিছুতেই। বাবু একটু পর পর খালি কাঁদছে। মায়ান ও বাবুর কান্না দেখে কাঁদছে,আর আমিও। কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়লো মায়ান। মিহিও জ্বর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ঘুমাতে পারলাম না।

যত সময় যাচ্ছে মিহির জ্বর বাড়ছেই। কি করবো বুঝতে পারছি না। সারিদকেও ফোনে পাচ্ছি না। ওর কলিগ ২/৩ জনের নাম্বার আছে আমার কাছে। তাদের মধ্যে একজন কে ফোনে পেলাম।

-ভাই,সারিদকে ফোনে পাচ্ছি না। বাবুর অনেক জ্বর। আপনি একটু দেখেন না যোগাযোগ করা যায় কিনা।
-আচ্ছা ভাবী আপনি চিন্তা করবেন না আমি দেখছি। ডাক্তার দেখিয়েছেন?
-না,দিনে বুঝি নি এমন জ্বর হবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি না কি করবো।
-এখন তো রাত ২ টা বেজে গেছে। কাল সকালে আমি আসবো। চিন্তা করবেন না ঠিক হয়ে যাবে। আর আমি জানাচ্ছি আপনাকে সারিদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হলে।

আমি ফোন রেখে আবার সারিদকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না। ওইদিকে তাহসান ভাইয়ের ও কল আসছে না। কিছুক্ষন পর তাহসান ভাইয়ার কল আসলো।

-স্যরি ভাবী, সারিদকে পেলাম না। আপনি চিন্তা করবেন না আমি কাল সকালেই আসবো।
-আচ্ছা।

একটু পরে আবার মিহির ঘুম ভেঙে গেলো। কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছে ও। আমি ওকে স্যারেলাক খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। অনেক কষ্টে ২/৩ চামচ খেলো।তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ওকে কোলে নিয়ে বসে বসে সকালের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

মানসিক রোগী
পর্বঃ এক

 

(চলবে…)

লেখিকাঃ সামিরা নাজ, চতুর্থ বর্ষ শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।