বিশ্বের ‘সেরা মা’ হিসেবে ভূষিত হচ্ছেন আদিত্য

বিশ্ব শীর্ষ খবর

আদিত্য তিউয়ারি, ভারতের পুনের বাসিন্দা। ২০১৬ সালে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি। চলতি বছর নারী দিবসে বিশ্বের ‘সেরা মা’ হিসেবে ভূষিত হচ্ছেন আদিত্য। শুনে অবাক লাগতে পারে যে, একজন পুরুষ কিভাবে সেরা মা হবেন।

কিন্তু আদিত্যর মতে, একটা শিশুকে লালন-পালনের বিষয়টা নারী বা পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তিনি শুরু থেকেই শিশুটিকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে, যত্ন করে বড় করছেন। ২০১৬ সালে ইন্দোরের মিশনারিজ অফ চ্যারিটির একটি অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন আদিত্য। সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় ছোট্ট অবিনাশের। এক বছর ৯ মাসের শিশুটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিল। হৃত্পিন্ডে ছোট ছিদ্রও ছিল তার।

আশ্রম থেকেই আদিত্য জানতে পারেন যে, এই রোগের কারণেই ফুটফুটে শিশুটিকে ফেলে চলে গেছে তার বাবা-মা। বেশ কয়েকদিন পর আবার ওই অনাথ আশ্রমে যান আদিত্য। খোঁজ নেন, কোন কোন শিশুকে দত্তক নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি শিশুকে দত্তক নেওয়া হলেও, পরিবার পায়নি ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত অবিনাশ। সেই মুহুর্তে শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ভেবে ফেলেন তিনি। উঠেপড়ে লেগে পড়েন শিশুটিকে নিজের কাছে পেতে, বাবার পরিচয় দিতে, একটা সুস্থ পরিবার দিতে।

পুরো ব্যাপারটা নিজের কাছে সহজ বলে মনে হলেও, পরিবার ও সমাজের কাছে অনেক লড়াই করতে হয়েছে আদিত্যকে। এত কম বয়সে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিষয়টি মানতে পারেননি তার নিজের মা-বাবাই। অন্যদিকে, আশ্রম থেকে জানানো হয়, বিবাহিত না হলে শিশু দত্তক দেওয়া যাবে না। আদিত্য বেশ ঝামেলায় পড়ে যান। তবে তিনি দমে যাননি।

পরিবারের সম্মতি না থাকা সত্ত্বেও, বেশ কয়েকমাস পর আবার যান ওই অনাথ আশ্রমে। সেখানে গিয়ে সিস্টারদের কাছে কাকুতি-মিনতি করেন শুধমাত্র শিশুটিকে পাওয়ার আশায়। হাল ছাড়েননি আদিত্য। মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও মানেকা গান্ধীর কাছে বিষয়টি জানিয়ে প্রায় ১শটি মেইল পাঠান।

আদিত্যের মেইল পড়ে অনাথ আশ্রমে যান মানেকা গান্ধী। দেখা করেন বিন্নির সঙ্গে। সব কিছু দেখে মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন, আদিত্যকে যেন দ্রুত শিশুটিকে দত্তক দেওয়া হয়। তারপরও চলেছে টালবাহানা। সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও শিশুটিকে নিজের কাছে পেতে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে।

আর শিশুটিকে পাওয়ার পর শুরু হয় অন্যরকম একটা যুদ্ধ। অসুস্থ একটা শিশুকে বুকে আগলে ঠিক মায়ের মতোই বড় করে তুলেছে সে। আর সে কারণেই সে ওই শিশুটির কাছে মায়ের চেয়ে কম কিছু না।

আদিত্য বলেন, ও আমার কাছে ঈশ্বরের সবচেয়ে সেরা উপহার। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। আমি নিজেকে কখনও তার মা অথবা বা হিসেবে দেখি না। আমি সব সময় তার একজন ভালো অভিভাবক হতে চেয়েছি। একই সঙ্গে তার কাছে একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছি।

তিনি বলেন, অবিনাশই আমাকে শিখিয়েছে যে, কিভাবে একজন ভালো অভিভাবক হওয়া যায়। একটা ধরাবাধা নিয়ম আছে যে, একজন নারীই তার সন্তানের দেখাশুনা করেন। আর সে কারণেই তাকে দত্তক নেয়ার সময় আমাকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে ভালো বিষয় হচ্ছে অবিনাশ আমাকে তার অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েছে।

একটি আইটি ফার্মে চাকরি করতেন আদিত্য। অবিনাশকে দত্তক নেয়ার পর তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি অবিনাশের মতো বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বাবা-মাকে কাউন্সেলিংয়ের কাজ করছেন। এ ধরনের একটি শিশুকে কিভাবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে একটি কনফারেন্সে যোগ দিতে জাতিসংঘ থেকে অবিনাশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অবিনাশের কাছেই আদিত্যই তার মা, আদিত্যই তার বাবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *