!! প্রকাশিত হলেই বিকশিত নয় !!

প্রবন্ধ সাহিত্য সিলেট

মোহাম্মদ আব্দুল হক

যে বা যারা সবার তালে তাল খুঁজে নিজেকে বিলিয়ে দেয় তার নিজস্বতা কতোটা আছে সে ব্যাপারে আমি সন্দিগ্ধ। সন্দেহ নেই সমাজে এমন মানুষের প্রকাশ বেশি। তবে এরা সাময়িক একটা আসন পেলেও বিকশিত হয়না। গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে ভেসে প্রকাশিত হলেই তা বিকশিত নয়। আপনি যখন অনেকের মধ্যে থেকেও আলাদা কিছু উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হবেন, তখন না বুঝে নিন্দুক নিন্দা করবে এবং আপনার চলার গতি আটকে দিতে চাইবে। তারপরও সত্য হলো, আপনি অবিচল থাকলে সত্য আপনাকে বাহন করেই হবে প্রকাশিত এবং বিকশিত। তবে এ বড়ো কঠিন কাজ। প্রথমেই দেখা যাবে আপনার পাশ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাবে বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন এবং ধীরে ধীরে অভাব এসে আপনার সত্য পথের গতিকে চেলেঞ্জ করবে। আপনি আপনার প্রকাশের বিকাশ চাইলে লোভ-লালসা পূর্ণ সমাজের শিয়াল স্বভাবের মানুষকে মোকাবেলা করতে সাথে কাউকে পেতে পারেন। এই বিশ্বাস আছে। সবসময় সত্য একেবারে বন্ধুহীন হয়না। সত্যের বিকাশ দরকার। চাই মৌলিকতা, চাই নিজস্বতা, চাই সত্য ও সুন্দরের দুঃসাহসী প্রকাশ। এসবই একদিন আপনাকে করবে বিকশিত। আপনি এখানে থেকেই দিনে দিনে কালে কালে পৌঁছে যাবেন সেখানে এবং সবখানে। আপনার মৌলিক চিন্তার প্রকাশের দ্বারা নিরবে ঘটে চলে আপনার উজ্জল বিকাশ। কেউ কেউ জানে আবার অনেকেই তা জানেনা।

আপনি জীবনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সুনাম ও বিজয় অর্জন করে বিকশিত হয়ে টিকে থাকতে চাইলে তাড়াহুড়ো করে দৌড় দিলে অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছতে পারবেন না। আপনি সম্মানিত ও বিকশিত হতে চাইলে ধীরে ধীরে পথে আলো জ্বেলে এগিয়ে চলুন। বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রকাশ মাধ্যমের অভাব নেই। নানান রকম মাধ্যমে লেখক নিজের লেখা বা কথা প্রকাশ করে থাকেন। এ খারাপ নয়। কিন্তু মনে রাখা চাই, আপনি কিছু লিখে প্রকাশ ঘটালেই আপনি বিকশিত নয়। আজকাল প্রায় প্রত্যেক কবি-লেখকের ব্যক্তিগত অনেক প্রকাশ মাধ্যম আছে। ফেসবুক, ব্লগ, হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপ ইত্যাদি আমাদের দেশে অধিক জনপ্রিয়। এসব মাধ্যমে অনেকেই নিজের ছড়া, কবিতা, গল্প, নিবন্ধ/প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশিত হই বা হতে চেষ্টা করি। ফেসবুকে লিখে থাকি এবং এতে আমরা লাইক পেয়ে থাকি ৫০ – ৫০০ বা তারও বেশি। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, বিকশিত হয়ে গেছি। তাহলে প্রশ্ন হলো, লিখে বিকাশ ঘটানো কিভাবে সম্ভব? হ্যাঁ, লিখে নিজের বিকাশ করা বা বিকশিত হওয়ার জন্যে নিজের সৃষ্টিতে নতুন ও মৌলিক কিছু নিয়ে আসতে হবে। আমরা অনেকেই অন্যের মতো করে লিখতে, বলতে ও চলতে চেষ্টা করি। আরেকটু সহজ করে বলি, কোনো বিখ্যাত গায়ক বা গীতিকার যে সুরে গান গেয়েছেন বা লিখেছেন আমরা অনেকেই সেই বিখ্যাত শিল্পীর গাওয়া সুরে শুধু শব্দ বা কথা পরিবর্তন করে নিজের পছন্দমতো শব্দ বা কথামালা সংযোজন করে গেয়ে থাকি, এতে উপস্থিত সময়ে উপস্থাপক কিছু বাহবা ও পুরস্কার পেলেও তা এখানেই থামে। শহরে কিংবা গ্রামে আমাদের গান প্রিয় মানুষের অনেকেই শাহ আব্দুল করিমের বিভিন্ন গানের হুবুহু সুরে কেবল কথা পরিবর্তন করে গেয়ে হাততালি পেয়েছেন, তবে এখানে মূলত শাহ আব্দুল করিমের গানের নকল হয়েছে মৌলিক কিছু হয়নি। তাই শাহ আব্দুল করিম বিকশিত হচ্ছেন। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ নামক বিখ্যাত কবিতার অনুকরণে নানান শব্দে কোনো কবিতা গড়ে প্রকাশিত হলে মূলত কাজী নজরুল ইসলাম বিকশিত হবেন। আমাদের পল্লী কবি খ্যাত জসিম উদ্দিনকে অনুকরণ করে তার কোনো ছড়া বা কবিতার হুবুহু ঢঙে শুধু শব্দ পরিবর্তীত করে লিখে আবৃত্তি করলে শ্রুতিমধুর হবে এবং জ্ঞানী সাহিত্যিক মাত্রেই বুঝে যাবেন কবি জসিম উদ্দিনের অমুক লেখার অনুকরণ। এতে কবি জসিম উদ্দিন যে কতো বড়ো মাপের কবি সেটাই বারবার উদ্ভাসিত হবে। এভাবে অনুকরণ করে লিখলে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে না। তাই প্রকৃত অর্থে বিকাশ হয়না। বরং এখানে আলোচনায় চলে আসেন সেই ব্যক্তি, যাকে অনুকরণ করা হয়েছে। কারণ যাঁকে অনুকরণ করা হলো তাঁর মৌলিক সৃষ্টি-ই এখানে প্রাধান্য পায়। এভাবেই ওই মৌলিক স্রস্টাই আরো বিকশিত হতে থাকেন যুগে যুগে।

কথা বদলে কোনো বিখ্যাত গীতিকার বা কবি-সাহিত্যিকের কোনো লেখা বা গান উপস্থাপন অনেক সময় হয় চমকপ্রদ। এটা অনুকরণ। জানা আছে নিশ্চয় অনুকরণ এর প্রতিশব্দ হলো নকল। এখানে নিজস্বতা ফুটে না। ভালো কিছুর অনুকরণ করে চললে ভালো চলা যায়। এ খারাপ নয়। কিন্তু এখানে নিজের বিকাশের সুযোগ কম। কারণ ; এখানে আপনি বা আমি কেবলই অন্যকে অনুকরণ করে তাকেই আরো বেশি বিকশিত করছি। কোনো লেখা বা যেকোনো সৃষ্টির দ্বারা নিজেকে বিকশিত করতে হলে লেখায় মৌলিকতা থাকা চাই। মৌলিক সৃষ্টি সবসময় স্রস্টাকে তড়িঘড়ি বিকাশ দেয়না। এর জন্যে অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় প্রকাশিত মৌলিক লেখার গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমাজের মানুষের সময় লেগে যায়। আমরা সময় এবং সময়ের পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হই। তখন ওই সময়ের সাথে মানানসই কোনো ছড়া বা কবিতার চরন বা কোনো প্রবন্ধের বিশেষ বাক্যাংশ আমরা সামনে নিয়ে আসি। হ্যাঁ সবসময় মৌলিক লেখাও লেখককে দ্রুত বিকশিত করেনা। সে ক্ষেত্রে অনেকের অনেক মৌলিক লেখা লেখকের মৃত্যুর পরেও তাকে বিকশিত করে। কোনো লেখার প্রকাশ এবং বিকাশ এক নয়। অতএব, আমি মনেকরি সমাজের মানুষের মাঝে প্রভাব পড়ে এমন মৌলিক লেখা নিয়ে আসতে পারলে সময়ে লেখকের বিকাশ ঘটবে।।
# লেখক _ কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *