পর্যটন নগরী সিলেট

সাহিত্য

মুহাম্মদ শাসুল ইসলাম সাদিক
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাংলাদেশ। আমাদের দেশে প্রতি প্রান্তরে ছড়িয়ে চিটিয়ে আছে পর্যটনের নানা উপাদান। তেমনি বাংলাদেশের এক বিচিত্র সুন্দরতম জায়গা সিলেট অঞ্চল। আধ্যাত্মিক নগরী খ্যাত সিলেটকে বলা হয়ে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। বিস্তীর্ণ সবুজ-শ্যামল মনোরম চা-বাগানের জন্য এই উপাধি পেয়েছে সিলেট অঞ্চল। সিলেটের যেদিকে চোখ যাবে, সেদিকেই দেখা যাবে সবুজে ঘেরা চা-বাগান। ছোটোবড়ো পাহাড়-টিলা, হাওর, নদী, বনাঞ্চল, ঝরনার এক অপরূপ সমারোহ আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট অঞ্চল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত জেলা সিলেট। রাজধানী থেকে মাত্র ২৭৮ কিলোমিটার দূরে আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটের অবস্থান। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটন। সিলেটে রয়েছে উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ মালনীছড়া চা-বাগান। এই অঞ্চলে আসা পর্যটকদের মন জুড়ায় সৌন্দর্যের রানি খ্যাত জাফলং, নীলনদ খ্যাত স্বচ্ছ জলরাশির লালাখাল, পাথর-জলের মিতালীতে বয়ে যাওয়া বিছনাকান্দির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা পাংথুমাই ঝরনা, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, ‘মিনি কক্সাবাজার’ খ্যাত হাকালুকির হাওর ও কানাইঘাটের লোভাছড়ার সৌন্দর্য।
সবুজের সমারোহ, নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে অপরূপ প্রকৃতি, পাশাপাশি উঁচু-নিচু ছোটোবড়ো পাহাড়-টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। সবুজ গালিচাই হলো সিলেটের চা-বাগান। সিলেটের চায়ের খ্যাতি রয়েছে সারা বিশ্বময়। দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশই উৎপন্ন হয় আমাদের সিলেট অঞ্চলে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বেশ ভালো লাগার ধারক হয়ে আছে সিলেটের চা-বাগান। বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা-বাগানের মধ্যে সিলেটে রয়েছে ১৩৫টি। সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলায় রয়েছে ছোটোবড়ো বেশ কয়েকটি চা-বাগান। পরিবেশের সাথে যে কোনো একটি দিন উপভোগ করতে গেলে কীভাবে দিন কেটে যাবে, তা প্রকৃতিক প্রেমিক ছাড়া আর কেহ টের পাবেনা।
সিলেট অঞ্চলের পর্যটনের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই যে নামটি চলে আসে, তা হলো সৌন্দর্যের রানি খ্যাত জাফলং। জাফলং সিলেট বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটননগরী। সিলেট শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া পাহাড়ের কোলে মারি নদীর পাশে অবস্থিত পাহাড়, সবুজ বন ও বাগানের সৌন্দর্যঘেরা একটি পাহাড়ি অঞ্চলের নাম জাফলং। হিমালয় থেকে সৃষ্ট মারি নদী, এখানে প্রচুর পরিমাণে পাথরখন্ড বয়ে নিয়ে আসে। চা-বাগান এবং পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পাথরের বিরল সৌন্দর্যের সেখানে দেখা মিলে। বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল বন। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় রাতারগুল বন অবস্থিত। পর্যটকপ্রেমিকদের কাছে এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গা নিয়ে এই বনাঞ্চল গঠিত। রাতারগুল এটি প্রাকৃতিক বন। এরপরও বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচ, মুতাসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়ে দেয় এই বনে। এছাড়া রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কদম, জালিবেত, অর্জুনসহ জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা। সিলেট অঞ্চলের রাতারগুল সুন্দরবন নামে খ্যাত। ভরা বর্ষায় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর হাজারো স্মৃতি ভোলা যাবে না অতি সহজে।
সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুর উপজেলায় স্বচ্ছ নীল পানির নদী ‘লালাখাল’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। প্রকৃতিকে একান্তে অনুভব করার জন্য বেশ উপযোগী। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা-বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখাল জুড়ে। পানি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা পর্যটককে দেবে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। বেশির ভাগ পর্যটক লালাখাল ভ্রমণের জন্য নদীপথ ব্যবহার করে থাকে। নৌপথে যেতে যেতে যেদিকে চোখ যায়, মুগ্ধতায় প্রাণ ভরে যায় কিছুক্ষণের জন্য। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত জাফলংয়ের মতোই বিছনাকান্দি একটি পাথরকোয়ারি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে একসাথে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে সুউচ্চ ঝরনা ধারা। প্রকৃতিপ্রেমিকের জন্য এই স্পটের মূল আকর্ষণ পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির প্রবাহ। বর্ষায় থোকা থোকা মেঘ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে, মনে হতে পারে মেঘেরা পাহাড়ের কোলে বাসা বেঁধেছে।
পাংথুমাই হচ্ছে সিলেট অঞ্চলে আরেকটি অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেবর্তী মেঘালয়ের কোলে এক অসম্ভব সুন্দর গ্রাম পাংথুমাই। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পাংথুমাই গ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়, ঝরনা, ঝরনা থেকে বয়ে আসা পানির স্রোতধারা আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ-শ্যামল ভূমির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনাচার সবকিছু মিলে একাকার এই পাংথুমাই। পাংথুমাই এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পাহাড়ঘেঁষা আঁকাবাঁকা রাস্তা। গ্রামের শেষে পাহাড়ি ঝরনার জলরাশি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারাটি মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝরনা নামে বেশ পরিচিত। প্রকৃতিপ্রেমিকেদের কাছে জলপ্রপাতটি পাংথুমাই ঝরনা নামে খ্যাত। সমগ্র সিলেট অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে ছোটো-বড়ো অসংখ্য হাওর। এর মধ্যে হাকালুকি হাওর অন্যতম। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা নিয়ে সিলেটের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি। বর্ষাকালে হাকালুকি হাওরকে সাগরের মতো মনে হয় এবং গ্রামগুলোকে মনে হয় একেকটা ছোট্ট দ্বীপ। বছরের প্রায় সাত মাস হাওর পানির নিচে অবস্থান করে। যাতায়াতের জন্য নৌকাই প্রধান বাহন। হাকালুকি হাওরে ৮০টি ছোটো এবং ৯০টি মাঝারি ও বড়ো বিল রয়েছে। শীতকালে এসব বিলে অতিথি পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। দেশর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে আসে পাখিদের এই মিলনমেলা দেখতে। শীতের হাকালুকি যেন এক অন্য জগৎ, মনোলোভা দৃশ্য দেখে মন হারিয়ে যায় এক পলকে। শীতের প্রকোপ যতই বাড়তে থাকে, অথিতি পাখির আসার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিশাল এলাকা জুড়ে শুধুই কিচিরমিচির আর নানান রঙের ডানা ঝাঁপটানোর দৃশ্য আর হাওড়ের মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো বিলে শাপলা আর পদ্মের বাগান যেন কেউ সাজিয়ে রাখে পর্যটনপ্রেমিদের জন্য।
সিলেট অঞ্চল পর্যটননগীর খ্যাত। কিন্তু কিছু কিছু স্থানে যোগাযোগব্যবস্থার কারণে পর্যটকদের পড়তে হয় নানাবিধ দুর্ভোগে। তাই পর্যটনকেন্দ্র যাতায়াতের রাস্তাাঘাট আরো প্রশস্ত ও সুগম হওয়া উচিত। নির্বিঘ্নে পর্যটনকেন্দ্রে বিচরণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা গেলে সিলেট হয়ে উঠতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সিলেটের স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক পরিকল্পনা সিলেটকে এনে দিতে পারে পর্যটনশিল্পে গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য। বর্তমানে বিশ্বের মোট পর্যটকের প্রায় ৫০ শতাংশ ভ্রমণ করে ইউরোপে। আর প্রায় ২৫ শতাংশ ঘুরতে আসে এশিয়ায়। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যটক ভ্রমণ করবে এশিয়া মহাদেশে। তাই এসুযোগ আমাদের লক্ষ্য ও সমস্ত কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা উচিত নিজেরদের ভবিষ্যতের জন্য। আমাদের দেশ পর্যটনক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনায় বেশ পিছিয়ে আছে। এমনকি বাংলাদেশ প্রতি বছর ভ্রমণের জন্য কী পরিমাণ বিদেশি পর্যটক আসে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। ফলে তাদের আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ ও সঠিক চাহিদা নিরূপণ করা যায় না, যা আমাদের অনেকখানি পিছিয়ে দিচ্ছে। পর্যটনের যে বিপুল সম্ভাবনা এই অঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, তার থেকে কীভাবে আমরা উন্নতি হব, তা ঠিক করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এ জন্য পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *