নজরুলের প্রথম কবিতা ও সেই চিঠি..

তাইসির মাহমুদ: বত্রিশ পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েড পত্রিকা বের করতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে বিশ-ত্রিশ হাজার শব্দ পড়া হয়ে যায়। অর্থাৎ, পড়াটা অনেকটা বাধ্যতামুলক। পড়তে গিয়ে প্রতিদিনই কিছুনা কিছু শেখাও হয় । কবি নজরুলের ১২১তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে চলতি সপ্তাহে বিশেষ সাময়িকী বের করতে গিয়ে প্রিয় কবি সম্পর্কে অরো অনেক কিছু জানার সুযোগ হলো।
নজরুলের লেখা প্রথম কবিতাটির নাম ছিলো ‘ক্ষমা’। সৈনিক জীবনে করাচি সেনা ছাউনীতে বসে কবিতাটি লিখে পাঠিয়েছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা’য় । পত্রিকাটি কবিতার নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তি’ শিরোনাম দিয়ে প্রকাশ করে । তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদ উল্লাহ। কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর নজরুল আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিনয় প্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন সম্পাদকের কাছে। চিঠিটি পড়ে খুবই আনন্দ পেলাম।

চিঠির এক জায়গায় নজরুল লিখেছেন: “আপনার নিকট যে কত বেশী কৃতজ্ঞ, তা প্রকাশ করার ভাষা পাচ্ছিনে। আপনার এরূপ উৎসাহ বরাবর থাকলে আমি যে একটি মস্ত জবর কবি ও লেখক হব, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিব, এ একেবারে নির্ঘাৎ সত্যি কথা।”
আরো এক জায়গায় লিখেছেন: “আমি বিশেষরূপে জানি, সম্পাদক বেচারাদের গলদঘর্ম হয়ে উঠতে হয় এই নতুন কাব্যিরোগাক্রান্ত ছোকরাদের দৌরাত্ম্যিতে।”
চিঠিটি হুবুহ তুলে ধরাই বাঞ্ছনীয়।

‘From:
QAZI NAZRUL ISLAM
Battalion Quartermaster Havilder
49th Bengalis,
Dated, Cantonment, Karachi
The 19th August, 1919
আদাব হাজার হাজার জানবেন!
বাদ আরজ, আমার নগণ্য লেখাটি আপনাদের সাহিত্য পত্রিকায় স্থান পেয়েছে, এতে কৃতজ্ঞ হওয়ার চেয়ে আমি আশ্চর্য হয়েছি বেশী। আমার সবচেয়ে ভয় হয়েছিল, পাছে বেচারী লেখা ‘কোরকে’র কোঠায় পড়ে। অবশ্য যদিও আমি ‘কোরক’ ব্যতীত প্রস্ফুটিত ফুল নই; আর যদিই সে-রকম হয়ে থাকি কারুর চক্ষে, তবে সে বে-মালুম ধুতরো ফুল। যা হোক, তার জন্যে আপনার নিকট যে কত বেশী কৃতজ্ঞ, তা প্রকাশ করার ভাষা পাচ্ছিনে। আপনার এরূপ উৎসাহ বরাবর থাকলে আমি যে একটি মস্ত জবর কবি ও লেখক হব, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিব, এ একেবারে নির্ঘাৎ সত্যি কথা। কারণ, এবারে পাঠালুম একটি লম্বা চওড়া ‘গাথা’ আর একটি ‘প্রায় দীর্ঘ’ গল্প আপনাদের পরবর্তী সংখ্যা কাগজে ছাপাবার জন্যে, যদিও কার্তিক মাস এখনও অনেক দূরে। আগে থেকেই পাঠালুম, কেননা, এখন হতে এটা ভাল করে পড়ে রাখবেন এবং চাই কি আগে হতে ছাপিয়েও রাখতে পারেন। তা ছাড়া আর একটি কথা। শেষে হয়তো ভাল ভাল লেখা জমে আমার লেখাকে বিলকুল রদ্দি করে দেবে, আর তখন হয়তো এত বেশী লেখা না পড়তেও পারেন। কারণ আমি বিশেষরূপে জানি, সম্পাদক বেচারাদের গলদঘর্ম হয়ে উঠতে হয় এই নতুন কাব্যিরোগাক্রান্ত ছোকরাদের দৌরাত্ম্যিতে। যাক, অনেক বাজে কথা বলা গেল। আপনার সময়টাকেও খামকা টু’টি চেপে রেখেছিলুম। এখন বাকি কথা ক’টি মেহেরবাণী করে শুনুন।

যদি কোন লেখা পছন্দ না হয়, তবে ছি’ড়ে না ফেলে এ গরীবকে জানালেই আমি ওর নিরাপদে প্রত্যাগমণের পাথেয় পাঠিয়ে দেব। কারণ, সৈনিকের বড্ড কষ্টের জীবন। আর তার চেয়ে হাজারগুণ পরিশ্রম করে একটু আধটু লিখি। আর কারুর কাছে ও একেবারে Worthless হলেও আমার নিজের কাছে ওর দাম ভয়ানক। আর ওটা বোধ হয় সব লেখকের পক্ষেই স্বাভাবিক। আপনার পছন্দ হলো কি না, জানবার জন্যে আমার নাম-ঠিকানা লেখা একখানা Stamped খামও দেওয়া গেল এর সঙ্গে। পড়ে মতামত জানাবেন।

আর যদি এত বেশী লেখা ছাপাবার মত জায়গা না থাকে আপনার কাগজে, তা হলে যে-কোন একটা লেখা ‘সওগাতে’র সম্পাদককে hand over করলে আমি বিশেষ অনুগৃহীত হব। ‘সওগাতে’ লেখা দিচ্ছি দু’একটা করে। যা ভাল বুঝেন জানাবেন।

গল্পটি সম্বন্ধে আপনার কিছু জিজ্ঞাস্য বা বক্তব্য থাকলে জানালেই আমি ধন্যবাদের সহিত তৎক্ষণাৎ তার উত্তর দিব, কারণ, এখনও সময় রয়েছে।
আমাদের এখানে সময়ের money-value; সুতরাং লেখা সর্বাঙ্গসুন্দর হতেই পারে না। Undisturbed time মোটেই পাই না। আমি কোন কিছুরই কপি duplicate রাখতে পারি না। সেটি সম্পূর্ণ অসম্ভব।
By the by, আপনারা যে, ‘ক্ষমা’ বাদ দিয়ে কবিতাটির ‘মুক্তি’ নাম দিয়েছেন, তাতে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। এইরকম দোষগুলি সংশোধন ক’রে নেবেন। বড্ডো ছাপার ভুল থাকে, একটু সাবধান হওয়া যায় না কি? আমি ভাল, আপনাদের কুশল সংবাদ দিবেন। নিবেদন ইতি।
খাদেম
নজরুল ইসলাম
[নজরুল রচনাসম্ভার হতে উদ্ধৃত]’

সে যাক। নজরুল সাময়িকীতে আমরা যাদের লেখা ছেপেছি তাদের প্রত্যেকের প্রতি ‘সাপ্তাহিক দেশ’ পরিবারের গভীর কৃতজ্ঞতা । বিশেষ কৃতজ্ঞতা- কবি মোহাম্মদ খয়রুজ্জামান খসরুকে, যিনি লেখা সংগ্রহে সহায়তা করেছেন।

তাইসির মাহমুদ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
৫ জুন ২০২০